বর্তমান সময়ে নারীস্বাস্থ্য ও প্রজনন অধিকার নিয়ে সচেতনতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। তবুও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট ধারণার অভাব রয়ে গেছে। এর মধ্যে ‘ইমার্জেন্সি পিল’ অন্যতম। অনেক নারী প্রয়োজনীয় তথ্য না জেনেই এই পিল ব্যবহার করেন, আবার অনেকে একে নিয়মিত গর্ভনিরোধক হিসেবে ভুলভাবে গ্রহণ করেন। এই বিভ্রান্তি দূর করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ ভুল ধারণা ও ভুল ব্যবহার নারীস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আজকের লেখায় আমরা ইমার্জেন্সি পিলের ব্র্যান্ড কোনটি ভালো এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল কোনটা ভালো সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
অনেক নারীর মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে যে ইমার্জেন্সি পিল গর্ভপাত ঘটায়। বাস্তবে এটি গর্ভপাতের ওষুধ নয়। সাধারণত এই পিল নিষিক্ত ডিম্বাণুর জরায়ুতে সংযুক্ত হওয়া প্রতিরোধ করে কাজ করে। যদি ইতোমধ্যে গর্ভধারণ স্থায়ী হয়ে যায়, তাহলে ইমার্জেন্সি পিল তাতে কাজ করে না। এ কারণে সঠিক সময়ে ব্যবহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের আর্টিকেল থেকে আপনারা এ সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য জানতে পারবেন।
আরও পড়ুনঃ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি কোনটা ভালো?
ইমার্জেন্সি পিল কী?
ইমার্জেন্সি পিল, যা অনেকের কাছে ‘মর্নিং আফটার পিল’ নামেও পরিচিত, একটি বিশেষ ধরনের জরুরি গর্ভনিরোধক ওষুধ। অনিরাপদ যৌনসম্পর্কের পর অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি কমানোর জন্য এটি ব্যবহার করা হয়। সাধারণত তখনই এই পিলের প্রয়োজন হয়, যখন যৌনমিলনের সময় কনডম ছিঁড়ে যায় বা সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় না, কোনো ধরনের গর্ভনিরোধক ছাড়াই মিলন সম্পন্ন হয়, নিয়মিত জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল খেতে ভুল হয়ে যায় অথবা ধর্ষণের মতো দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়।
এসব ক্ষেত্রে দ্রুত সময়ের মধ্যে ইমার্জেন্সি পিল গ্রহণ করলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। তবে এটি নিয়মিত ব্যবহারের গর্ভনিরোধক নয়; কেবল জরুরি অবস্থায় ব্যবহারের জন্যই এই পিল তৈরি করা হয়েছে। ইমার্জেন্সি পিল নারীস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ব্যবস্থা হলেও এটি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে বা নিয়মিতভাবে এই পিল ব্যবহার করা উচিত নয়।
ইমার্জেন্সি পিলের জনপ্রিয় ব্র্যান্ডসমূহঃ
বাংলাদেশে মূলত লেভোনরজেস্ট্রেল গ্রুপের পিলগুলো সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। নিচে উল্লেখযোগ্য কিছু ব্র্যান্ডের বিস্তারিত তালিকা দেওয়া হলো:
Emcon 1
এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং বহুল ব্যবহৃত ইমার্জেন্সি পিল। রেনেটা লিমিটেড (Renata Ltd.) এটি বাজারজাত করে। এর প্রতিটি প্যাকেটে একটি মাত্র ট্যাবলেট থাকে যাতে ১.৫ মিলিগ্রাম লেভোনরজেস্ট্রেল থাকে। এক ডোজের হওয়ায় এটি সেবন করা সহজ।
i-Pill
ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড এই পিলটি তৈরি করে। আন্তর্জাতিকভাবেও ‘আই-পিল’ নামটির বেশ পরিচিতি রয়েছে। এটিও সিঙ্গেল ডোজ বা একটি পিলের প্যাক হিসেবে পাওয়া যায়। এর কার্যকারিতা এবং মান অত্যন্ত উন্নত।
Norix 1
এসএমসি (SMC) এর একটি জনপ্রিয় পণ্য হলো নোরিক্স ১। এটি সাধারণত সরকারি এবং বেসরকারি উভয় ফার্মাসিতেই খুব সহজে পাওয়া যায়। যারা অল্প মূল্যে ভালো মানের ইমার্জেন্সি পিল খুঁজছেন, তাদের জন্য এটি একটি ভালো পছন্দ।
Juliette
পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের এই পিলটি বাজারে বেশ পরিচিত। এটিও লেভোনরজেস্ট্রেল ১.৫ মিলিগ্রাম উপাদানে তৈরি এবং মিলনের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সেবন করতে হয়।
EC-Pill
জিসকা ফার্মাসিউটিক্যালস এটি উৎপাদন করে। এটিও উপরের পিলগুলোর মতোই সমান কার্যকর এবং একইভাবে সেবন করতে হয়।
অন্যান্য ব্র্যান্ড
এছাড়াও বাজারে Postinor, Emergency-1, Femipil এর মতো আরও বেশ কিছু ব্র্যান্ড পাওয়া যায়। তবে মনে রাখতে হবে, ব্র্যান্ড ভিন্ন হলেও এগুলোর মূল কাজ এবং উপাদান প্রায় একই।
ইমার্জেন্সি পিলের ব্র্যান্ড কোনটি ভালো?
ইমার্জেন্সি পিলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো ব্র্যান্ড বাছাই করার সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখা উচিতকোনও একটি ব্র্যান্ডের তুলনায় সব ক্ষেত্রেই ঠিক সেটাই সেরা বলে বলা কঠিন। ইমার্জেন্সি পিল কার্যকারিতা, নিরাপত্তা এবং ডোজের ওপর আলাদা আলাদা ব্র্যান্ডগুলোর পার্থক্য খুব বেশি থাকে না। বাজারে ইমার্জেন্সি পিলের অনেক গুলো ব্র্যান্ড আছে। আপনি ইমার্জেন্সি পিল খাওয়ার পূর্বে একজন চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন, তিনি যেটা খেতে পরামর্শ দিবেন সেটাই খেতে হবে।
বিশ্বাসযোগ্যতার দিক থেকে বিচার করলে বাংলাদেশের বাজারে রেনেটা লিমিটেডের Emcon 1 ইমার্জেন্সি পিলটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ও জনপ্রিয়। এটি একটি সিঙ্গেল ডোজ পিল হওয়ায় ব্যবহার করা সহজ একটি ট্যাবলেটই যথেষ্ট। দেশের শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত এলাকায়ও সহজলভ্য হওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি।
অন্যদিকে আধুনিক ফর্মুলা ও ওষুধের মানের বিচারে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের i-Pill একটি ভালো অবস্থান তৈরি করেছে। ইনসেপ্টার ওষুধ উৎপাদন আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে করা হয়, ফলে এর গুণগত মান নিয়ে ব্যবহারকারীদের আস্থা রয়েছে।
পিল সেবনের সঠিক নিয়ম ও সময়
ইমার্জেন্সি পিল কার্যকর হওয়ার জন্য সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম। অরক্ষিত মিলনের পর যত দ্রুত সম্ভব পিল খেতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পিল খেলে এর কার্যকারিতা ৯৫% পর্যন্ত থাকে। তবে ৭২ ঘণ্টা বা ৩ দিন পর্যন্ত এটি কাজ করে। ৩ দিন পর খেলে এর কার্যকারিতা অনেক কমে যায়।
ইমার্জেন্সি পিল বাছাই করার সময় যা মনে রাখবেনঃ

বাজারে অনেক ব্র্যান্ড থাকলেও মূল কাজ সবারই এক। তবে পিল কেনার সময় কিছু বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি। ওষুধের মেয়াদের দিকে অবশ্যই খেয়াল রাখুন। মেয়াদোত্তীর্ণ পিল শুধু অকার্যকরই নয়, শরীরের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। কিছু ব্র্যান্ডে প্যাকেটের ভেতরে ২টি পিল থাকে। সেক্ষেত্রে প্রথম পিলটি দ্রুত এবং দ্বিতীয় পিলটি প্রথম পিলের ঠিক ১২ ঘণ্টা পর সেবন করতে হয়। তবে এখনকার প্রায় সব ব্র্যান্ডই ১টি পিলের সেট দেয়। সব সময় ভালো এবং নামকরা ফার্মাসি থেকে ওষুধ কিনুন যাতে ওষুধের গুণমান বা স্টোরেজ কন্ডিশন সঠিক থাকে।
অসুরক্ষিত যৌনসম্পর্কের পর যত দ্রুত সম্ভব বিশেষ করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পিলটি সেবন করা উচিত, কারণ সময় যত বেশি গড়ায়, এর কার্যকারিতা তত কমে যায়। দ্বিতীয়ত, পিল খাওয়ার পর যদি ২ ঘণ্টার মধ্যে বমি হয়ে যায়, তাহলে দেরি না করে আরেকটি পিল গ্রহণ করা প্রয়োজন, কেননা বমির সঙ্গে ওষুধ শরীর থেকে বেরিয়ে গেলে তা কার্যকর হয় না। একেবারে খালি পেটে ইমার্জেন্সি পিল না খাওয়াই ভালো; বরং হালকা কিছু খাবার খেয়ে নিলে বমি ভাব বা অস্বস্তির সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
কী মানদণ্ড দেখে ভালো ইমার্জেন্সি পিল ব্র্যান্ড নির্বাচন করা উচিত?
বড় এবং নামকরা কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে ওষুধ তৈরি করে। এদের কাঁচামাল এবং মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনেক বেশি কঠোর থাকে। লো ব্র্যান্ডের পিলগুলো সাধারণত উন্নতমানের অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল বা ব্লিস্টার প্যাকেজিংয়ে আসে। ভালো মানের ব্র্যান্ডগুলো তাদের ফর্মুলা এমনভাবে তৈরি করে যাতে পিলটি সেবনের পর বমি ভাব বা বমি হওয়ার ঝুঁকি সর্বনিম্ন থাকে। ওষুধের বিশুদ্ধতা যত বেশি হবে, শরীর তা তত সহজে গ্রহণ করবে। আরেকটি ব্যাপার সেটি হচ্ছে মেয়াদ শেষ হওয়ার কাছাকাছি থাকা ওষুধ না কেনাই ভালো।
পরিশেষে
ইমার্জেন্সি পিল ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়া অত্যন্ত জরুরি। কোন ব্র্যান্ড ভালো তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো পিলটি অনুমোদিত, মানসম্মত ও নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে সংগ্রহ করা এবং সঠিক সময়ে সেবন করা। ইমার্জেন্সি পিল কখনোই নিয়মিত গর্ভনিরোধক পদ্ধতির বিকল্প নয়; এটি কেবল অনাকাঙ্ক্ষিত বা জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রযোজ্য। সঠিক তথ্য ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ব্যবহার করলে এই পিল অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। আশা করি ইমার্জেন্সি পিলের ব্র্যান্ড কোনটি ভালো সে সম্পর্কে আপনারা সঠিক ধারণা পেয়েছেন।