HCG Level কি? HCG Level কীভাবে পরীক্ষা করা হয়?

এইচসিজি টেস্ট একটি বিশেষ ধরনের রক্ত পরীক্ষা, যার মাধ্যমে গর্ভধারণের সময় শরীরে তৈরি হওয়া হরমোনে HCG এর পরিমাণ নির্ণয় করা হয়। এই পরীক্ষাটি মূলত গর্ভাবস্থা নিশ্চিত করা, গর্ভের স্বাভাবিক অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা এবং কিছু নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যগত সমস্যা চিহ্নিত করার জন্য করা হয়। পরীক্ষার জন্য সাধারণভাবে রক্তের নমুনা নেওয়া হয় এবং সাধারণত ১২ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই রিপোর্ট পাওয়া যায়। আজ আমরা জানবো HCG level কি এবং এ সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য।

আরও পড়ুনঃ গর্ভাবস্থায় স্তনে ব্যথা হওয়া স্বাভাবিক কি?  

HCG Level কি? 

HCG হলো একটি হরমোন যা গর্ভাবস্থায় প্লাসেন্টা বা জরায়ুর ফুল দ্বারা তৈরি হয়। যখন একটি নিষিক্ত ডিম্বাণু জরায়ুর দেয়ালে নিজেকে গেঁথে ফেলে, তখন থেকে এই হরমোন উৎপাদন শুরু হয়। প্রস্রাব পরীক্ষার মাধ্যমে গর্ভধারণ নির্ণয় সাধারণত ঘরোয়া প্রেগনেন্সি কিট ব্যবহার করে করা হয়। এই পরীক্ষায় প্রস্রাবে HCG হরমোনের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। গর্ভধারণ হলে এই হরমোন নিঃসৃত হয় এবং প্রস্রাবে পাওয়া গেলে কিটে পজিটিভ ফলাফল দেখা যায়। এটি সহজ, দ্রুত এবং ঘরেই করা যায় বলে প্রাথমিকভাবে গর্ভধারণ নিশ্চিত করতে অনেকেই এই পদ্ধতি ব্যবহার করেন।

অন্যদিকে, রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে গর্ভধারণ নির্ণয়কে বিটা এইচসিজি টেস্ট বলা হয়। এই পরীক্ষায় রক্তে HCG হরমোনের সঠিক মাত্রা বা পরিমাণ নির্ণয় করা হয়, যা গর্ভধারণের অবস্থা সম্পর্কে আরও নির্ভুল তথ্য দেয়। বিশেষ করে গর্ভাবস্থার বয়স নির্ধারণ, হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকভাবে বাড়ছে কিনা তা বোঝা এবং কিছু জটিলতা শনাক্ত করতে এই রক্ত পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

HCG Level কীভাবে পরিবর্তিত হয়? 

গর্ভাবস্থার প্রথম ত্রৈমাসিকের শেষ দিকে, অর্থাৎ প্রথম তিন মাসের মধ্যে, বিটা এইচসিজি হরমোনের মাত্রা সাধারণত সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে যায়। গর্ভধারণের শুরুতে, প্রায় ৬ থেকে ১১ দিনের মধ্যে এই হরমোনের মাত্রা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। প্রথম ১০ সপ্তাহে এইচসিজির পরিমাণ প্রতি কয়েক দিন অন্তর দ্বিগুণ হতে পারে। এরপর গর্ভাবস্থার অগ্রগতির সাথে সাথে এই হরমোনের মাত্রা হয় স্থিতিশীল থাকে, নয়তো ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে।

গত  পিরিয়ডের সপ্তাহ hCG Level (mIU/mL)
3 সপ্তাহ 5 – 50
4 সপ্তাহ 5 – 426
5 সপ্তাহ 18 – 7,340
6 সপ্তাহ 1,080 – 56,500
7 – 8 সপ্তাহ 7,650 – 229,000
9 – 12 সপ্তাহ 25,700 – 288,000
13 – 16 সপ্তাহ 13,300 – 254,000
17 – 24 সপ্তাহ 4,060 – 165,400
25 – 40 সপ্তাহ 3,640 – 117,000

HCG Level পরীক্ষার পদ্ধতিঃ

HCG Level Testing Method

HCG লেভেল পরীক্ষা করার দুটি প্রধান উপায় রয়েছে, একটি হচ্ছে প্রসাবের মাধ্যমে আরেকটি হচ্ছে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে। চলুন উপায় দুইটি দেখে নেওয়া যাক:

প্রস্রাব পরীক্ষার মাধ্যমে

এই পরীক্ষা সাধারণত ঘরোয়া প্রেগনেন্সি টেস্ট কিট দিয়ে করা হয়। এতে প্রস্রাবে HCG হরমোন আছে কি না তা শনাক্ত করা হয়। তবে এই পদ্ধতিতে HCG এর পরিমাণ জানা যায় না, শুধু উপস্থিতি বোঝা যায়। তাই এটি প্রাথমিকভাবে গর্ভধারণ নিশ্চিত করার জন্য বেশি ব্যবহার করা হয়।

  • সকালের প্রথম প্রস্রাব সংগ্রহ করা সবচেয়ে ভালো, কারণ এতে HCG হরমোনের ঘনত্ব বেশি থাকে।
  • একটি প্রেগনেন্সি টেস্ট কিট খুলে নির্দেশনা ভালোভাবে পড়ে নিন।
  • কিটে দেওয়া ড্রপার বা স্ট্রিপ ব্যবহার করে প্রস্রাব কিটে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলুন অথবা স্ট্রিপটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রস্রাবে ডুবিয়ে রাখুন।
  • নির্দেশনায় উল্লেখ করা সময় অপেক্ষা করুন।
  • কিটে Positive বা Negative লেখা দেখা যাবে। 

রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে 

এটি সবচেয়ে নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি। রক্তে থাকা HCG হরমোনের সঠিক মাত্রা বা সংখ্যা জানা যায়। এই পরীক্ষা গর্ভধারণ নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে এই পরীক্ষা করলে বোঝা যায় HCG হরমোন স্বাভাবিক হারে বাড়ছে কি না। 

  • ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিকটস্থ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যান।
  • ল্যাব টেকনিশিয়ান আপনার হাতের শিরা থেকে অল্প পরিমাণ রক্ত সংগ্রহ করবেন।
  • সংগ্রহ করা রক্ত ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়, যেখানে HCG হরমোনের সঠিক মাত্রা নির্ণয় করা হয়।
  • সাধারণত কয়েক ঘণ্টা বা একদিনের মধ্যেই রিপোর্ট পাওয়া যায়।
  • প্রয়োজনে ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর আবার একই পরীক্ষা করা হয়, যাতে দেখা যায় HCG লেভেল স্বাভাবিক হারে বাড়ছে বা কমছে কি না।

নিম্ন HCG লেভেলের কারণ কী? 

গর্ভাবস্থায় বিটা এইচসিজি লেভেল কম দেখা যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। অনেক সময় গর্ভধারণের সঠিক তারিখ ভুলভাবে হিসাব করা হলে এইচসিজির মাত্রা প্রত্যাশার তুলনায় কম মনে হতে পারে। এছাড়া, যদি এইচসিজি হরমোনের মাত্রা নিয়ম অনুযায়ী বৃদ্ধি না পেয়ে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে, তাহলে তা গর্ভপাতের ইঙ্গিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে এইচসিজি লেভেল খুব ধীরে বাড়ে এবং এটি একটি জরুরি চিকিৎসাগত অবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়।

উচ্চ HCG লেভেলের কারণ কী? 

গর্ভাবস্থায় বিটা এইচসিজি হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি হওয়ার পেছনেও বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। যদি গর্ভে যমজ বা তার বেশি সন্তান থাকে, তবে একাধিক ভ্রূণের কারণে এইচসিজি লেভেল সাধারণ গর্ভাবস্থার তুলনায় অনেক বেশি দেখা যায়। এছাড়া মোলার প্রেগনেন্সি একটি বিরল কিন্তু গুরুতর অবস্থা, যেখানে জরায়ুর ভেতরে স্বাভাবিক ভ্রূণের পরিবর্তে অস্বাভাবিক টিস্যু বৃদ্ধি পায়, যার ফলে এইচসিজির মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। 

অনেক সময় গর্ভধারণের তারিখ সঠিকভাবে নির্ণয় না হলে এবং গর্ভাবস্থা অনুমানের চেয়ে বেশি অগ্রসর অবস্থায় থাকলে পরীক্ষার রিপোর্টে এইচসিজি লেভেল বেশি দেখাতে পারে।

FAQs

HCG লেভেল কি প্রতিদিন বাড়ে? 

হ্যাঁ, HCG লেভেল গর্ভাবস্থার শুরুতে বাড়তে থাকে, তবে এটি প্রতিদিন সমান হারে বাড়ে এমনটা নয়। সাধারণত গর্ভধারণের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহে এই হরমোন খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। গর্ভাবস্থার প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতি ২ থেকে ৩ দিনে HCG লেভেল প্রায় দ্বিগুণ হওয়াকে স্বাভাবিক ধরা হয়। কখনো একদিন কম বাড়তে পারে, আবার পরের দিন তুলনামূলক বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে। 

মর্নিং সিকনেস কি HCG এর জন্য হয়? 

হ্যাঁ, রক্তে HCG  হরমোনের মাত্রা যখন সবচেয়ে বেশি থাকে, তখন গর্ভবতী নারীদের মধ্যে বমি বমি ভাব, বমি এবং অন্যান্য শারীরিক অস্বস্তি তুলনামূলকভাবে বেশি অনুভূত হয়। সাধারণত গর্ভাবস্থার ৮ থেকে ১০ সপ্তাহের মধ্যে HCG লেভেল দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এই সময়েই অনেক নারীর সকালবেলা বেশি বমি বমি ভাব, খাবারে অরুচি, মাথা ঘোরা এবং অতিরিক্ত ক্লান্তি দেখা যায়।

গর্ভপাতের কতদিন পর HCG শূন্য হয়? 

গর্ভপাতের পর শরীরে থাকা HCG হরমোন একেবারে শূন্যে নেমে যেতে সঙ্গে সঙ্গে সময় লাগে না। সাধারণত গর্ভপাতের পর রক্ত ও প্রস্রাব থেকে এই হরমোন পুরোপুরি সরে যেতে প্রায় ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এই সময়ের মধ্যে HCG লেভেল ধীরে ধীরে কমতে থাকে এবং শরীর স্বাভাবিক হরমোনগত অবস্থায় ফিরে আসার প্রক্রিয়া শুরু করে।

Author

  • ডাঃ তানহা একজন নিবেদিতপ্রাণ মেডিসিন ও গাইনী বিশেষজ্ঞ, যিনি বর্তমানে একটি সরকারি হাসপাতালে কর্মরত আছেন। অভ্যন্তরীণ রোগ ও নারীস্বাস্থ্য বিষয়ে তার বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। তিনি নারীদের স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সঠিক ও প্রমাণভিত্তিক তথ্য প্রচারে বিশ্বাসী। Emergencypillbd.com-এ তিনি নিয়মিতভাবে প্রেগন্যান্সি, পিরিয়ড, ইমার্জেন্সি পিল এবং নারীস্বাস্থ্য বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ লেখা শেয়ার করে থাকেন, যা নারীদের সুস্থ জীবনযাপনে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

Leave a Comment