পিরিয়ড মিস হওয়ার কত দিন পর প্রেগন্যান্সি টেস্ট করতে হয়?

একজন মহিলার গর্ভবতী হওয়ার প্রথম ও প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পিরিয়ড মিস হওয়া। তবে শুধুমাত্র পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে এটা ধরে নেওয়া ঠিক নয় যে মহিলাটি গর্ভবতী। অনেক সময় শারীরিক বা হরমোনজনিত কারণে পিরিয়ড সময়মতো না হওয়াও স্বাভাবিক। তাই নিশ্চিতভাবে গর্ভধারণ হয়েছে কি না তা জানার জন্য প্রেগন্যান্সি টেস্ট করানো জরুরি। আর সঠিক সময়ে টেস্ট করাও খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনেক সময় খুব আগেভাগে টেস্ট করলে ফলাফল সঠিক নাও হতে পারে।

প্রথম মাসে গর্ভবতী হলে সাধারণত দৃশ্যমান কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তবে নির্দিষ্ট পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে গর্ভধারণের বিষয়টি জানা সম্ভব। এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছি, কবে থেকে প্রেগন্যান্সি বোঝা যায়, পিরিয়ড মিস হওয়ার কত দিন পর প্রেগন্যান্সি টেস্ট করতে হয়, এবং গর্ভধারণের পর কতদিনে মাসিক বন্ধ হয় সবকিছু ধাপে ধাপে। এটি আপনাদের জন্য একটি নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে যাতে প্রেগন্যান্সি সম্পর্কিত বিষয়গুলো সহজে বোঝা যায় এবং সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।

আরও পড়ুনঃ পিরিয়ডের পর কখন গর্ভধারণের সম্ভাবনা বেশি?

প্রেগন্যান্সি টেস্ট করা প্রয়োজন? 

প্রথমেই বোঝা জরুরি, প্রেগন্যান্সি টেস্ট আসলে কেন করা হয়। প্রেগন্যান্সি টেস্টের মূল উদ্দেশ্য হলো গর্ভাবস্থা শনাক্ত করা। যখন একজন নারী গর্ভবতী হন, তখন তাঁর শরীরে HCG নামক হরমোন উৎপন্ন হয়। গর্ভধারণের প্রথম দিকে ভ্রূণ জরায়ুর সঙ্গে সংযুক্ত হলে একটি স্তর তৈরি হয়। এই স্তরই HCG হরমোন নিঃসৃত করতে শুরু করে। HCG হরমোনের প্রধান কাজ হলো গর্ভধারণকে বজায় রাখা। 

একজন নারী গর্ভবতী হলে তার শরীরে হিউম্যান কোরিওনিক গোনাডোট্রফিন (HCG) নামের একটি বিশেষ হরমোন তৈরি হতে শুরু করে। গর্ভধারণের প্রথম কয়েক সপ্তাহে এই হরমোনের মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। প্রেগন্যান্সি টেস্ট মূলত এই HCG হরমোনের উপস্থিতি শনাক্ত করার জন্য করা হয়, যা নিশ্চিতভাবে জানায় যে মহিলাটি গর্ভবতী কি না।

পিরিয়ড মিস হওয়ার কত দিন পর প্রেগন্যান্সি টেস্ট করতে হয়?

পিরিয়ড মিস হওয়ার অন্তত এক সপ্তাহ পর প্রেগন্যান্সি টেস্ট করা সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। কারণ পিরিয়ড মিস হওয়ার আগেই শরীরে HCG হরমোনের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম থাকে, যা টেস্টের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। যদি খুব আগেভাগে টেস্ট করা হয়, তাহলে ফলাফল নেগেটিভ দেখাতে পারে, এমনকি আপনি প্রকৃতপক্ষে গর্ভবতী হলেও।

যদি পিরিয়ড মিসের এক সপ্তাহ পর টেস্ট করার পরও ফলাফল নেগেটিভ আসে, কিন্তু মনে হয় আপনি গর্ভবতী হতে পারেন, তবে অবশ্যই একজন ডাক্তারকে দেখানো উচিত। ডাক্তার রক্তের মাধ্যমে HCG পরীক্ষা করলে আরও নির্ভুলভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়, এবং আপনি নিশ্চিতভাবে জানতে পারবেন আপনি গর্ভবতী কিনা।

পিরিয়ড মিস হওয়ার পরও কেন প্রেগন্যান্সি টেস্ট করলে নেগেটিভ আসে? 

পিরিয়ড মিস হওয়ার পরও প্রেগন্যান্সি টেস্ট কখনো কখনো নেগেটিভ দেখাতে পারে। এর প্রধান কারণ হলো hCG হরমোনের মাত্রা পর্যাপ্ত না থাকা। আরও কিছু কারণ থাকতে পারে যেগুলো নিচে উল্লেখ করা হলোঃ 

  • দ্রুত টেস্ট করা

গর্ভবতী হওয়ার পর শরীরে HCG (Human Chorionic Gonadotropin) হরমোন তৈরি হতে কিছুটা সময় লাগে। যদি পিরিয়ড মিস হওয়ার ১-২ দিনের মধ্যেই টেস্ট করেন, তবে হরমোনের মাত্রা যথেষ্ট না হওয়ায় রেজাল্ট নেগেটিভ আসতে পারে।

  • HCG হরমোনের দেরিতে বৃদ্ধি

গর্ভধারণের প্রথম কয়েকদিনে HCG হরমোনের মাত্রা খুবই কম থাকে। সাধারণত গর্ভধারণের ৬-১০ দিন পর এই হরমোন ইউরিনে detectable হয়। তাই পিরিয়ড মিস হওয়ার ঠিক পরপর টেস্ট করলে শরীরে পর্যাপ্ত HCG না থাকার কারণে ফলাফল নেগেটিভ দেখাতে পারে। 

  • প্রথম প্রেগন্যান্সির ক্ষেত্রে

প্রথমবার গর্ভবতী নারীর শরীরে HCG এর উৎপাদন ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে টেস্ট নেগেটিভ দেখানো স্বাভাবিক।

  • ভুল পদ্ধতিতে টেস্ট 

টেস্ট সঠিকভাবে ব্যবহার না করলে, যেমন যথাযথ সময় ইউরিন নেওয়া হয়নি বা পুরনো কিট ব্যবহার করা হয়েছে, তখনও নেগেটিভ ফলাফল আসতে পারে।

পিরিয়ড মিস হওয়ার পর কীভাবে প্রেগন্যান্সি টেস্ট করবেন?

How to do a pregnancy test

সবচেয়ে নির্ভুল ফলাফল পেতে সকালের প্রথম প্রস্রাব ব্যবহার করুন। সারারাত প্রস্রাব জমা থাকার কারণে এতে HCG হরমোনের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে। পরীক্ষার আগে প্রচুর পানি খাবেন না, কারণ এতে প্রস্রাব পাতলা হয়ে যেতে পারে। নিচে প্রক্রিয়াটি দেখে নিনঃ 

  • পরীক্ষা শুরু করার আগেই কিটের প্যাকেটের পেছনে থাকা এক্সপায়ারি ডেট নিশ্চিত হয়ে নিন। মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে কিট সঠিক ফলাফল দেবে না। এরপর সাবধানে প্যাকেটটি ছিঁড়ে কিটটি বের করুন।
  • একেক ব্র্যান্ডের কিট ব্যবহারের নিয়ম একেক রকম হতে পারে। তাই প্যাকেটের গায়ের নির্দেশনাগুলো একবার ভালো করে দেখে নিন। 
  • একটি পরিষ্কার ও পানিমুক্ত শুকনো পাত্রে আপনার সকালের প্রথম প্রস্রাব সংগ্রহ করুন। 
  • কিটের সাথে থাকা ছোট ড্রপারটি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট স্থানে পরিমিত পরিমাণে প্রস্রাব দিন। সাধারণত ২ থেকে ৩ ফোঁটা প্রস্রাব দেওয়ার প্রয়োজন হয়।
  • নমুনা দেওয়ার পর কিটটি একটি সমতল জায়গায় রেখে দিন। ফলাফল আসার জন্য ঘড়ি ধরে ৩ থেকে ৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। 

FAQs

HCG হরমোনের মাত্রা কত দিনে পর্যাপ্ত হয় যাতে ইউরিন টেস্টে পজিটিভ দেখায়?

ডিম্বাণু নিষিক্ত হওয়ার পর জরায়ুতে বসতে প্রায় ৬ থেকে ১২ দিন সময় লাগে। ইমপ্লান্টেশন হওয়ার পরেই কেবল শরীর HCG তৈরি করতে শুরু করে। ইমপ্লান্টেশন হওয়ার প্রায় ২ থেকে ৩ দিন পর রক্ত পরীক্ষায় হরমোনটি ধরা পড়ে। প্রস্রাব পরীক্ষায় পজিটিভ রেজাল্ট পেতে সাধারণত ওভুলেশনের পর ১২ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে। তবে যাদের পিরিয়ড অনিয়মিত, তাদের ক্ষেত্রে পিরিয়ড মিস হওয়ার ১ সপ্তাহ পর টেস্ট করা সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

প্রেগন্যান্সি টেস্টের নির্ভুলতা কোন কোন কারণে প্রভাবিত হতে পারে?

প্রেগন্যান্সি টেস্ট বা গর্ভাবস্থা পরীক্ষার নির্ভুলতা অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। অনেক সময় গর্ভবতী হওয়া সত্ত্বেও রেজাল্ট নেগেটিভ আসতে পারে, আবার গর্ভবতী না হয়েও পজিটিভ আসতে পারে। দিনের বেলা প্রচুর পানি বা তরল পান করলে প্রস্রাব পাতলা হয়ে যায়। এতে হরমোনের ঘনত্ব কমে যায়, ফলে কিট সঠিক রেজাল্ট দিতে পারে না। এজন্য সকালের প্রথম প্রস্রাব ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়।

পিরিয়ড মিস হওয়ার পর কত দিন পর্যন্ত প্রেগন্যান্সি টেস্টের জন্য অপেক্ষা করা উচিত?

পিরিয়ড মিস হওয়ার পর প্রেগন্যান্সি টেস্ট করার জন্য সাধারণত ১ সপ্তাহ অপেক্ষা করা সবচেয়ে ভালো। ১ সপ্তাহ অপেক্ষা করলে রেজাল্ট ৯৯% নির্ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যাদের পিরিয়ড নির্দিষ্ট সময় পর পর হয় না, তাদের জন্য হিসাব করা কিছুটা কঠিন। এক্ষেত্রে আপনার গত ৬ মাসের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ যে সাইকেল ছিল, সেই দিনটি পার হওয়ার পর টেস্ট করুন।

Author

  • ডাঃ তানহা একজন নিবেদিতপ্রাণ মেডিসিন ও গাইনী বিশেষজ্ঞ, যিনি বর্তমানে একটি সরকারি হাসপাতালে কর্মরত আছেন। অভ্যন্তরীণ রোগ ও নারীস্বাস্থ্য বিষয়ে তার বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। তিনি নারীদের স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সঠিক ও প্রমাণভিত্তিক তথ্য প্রচারে বিশ্বাসী। Emergencypillbd.com-এ তিনি নিয়মিতভাবে প্রেগন্যান্সি, পিরিয়ড, ইমার্জেন্সি পিল এবং নারীস্বাস্থ্য বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ লেখা শেয়ার করে থাকেন, যা নারীদের সুস্থ জীবনযাপনে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

Leave a Comment