জিনসেং কি কাজ করে? উপকারিতা, খাওয়ার নিয়ম ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে হার্বাল চায়ের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। সুস্থ জীবনযাপন নিশ্চিত করতে অনেকেই হার্বাল চায়ের প্রতি আস্থা রাখছেন। এসব হার্বাল চায়ের মধ্যে জিনসেং অন্যতম জনপ্রিয় ভেষজ উপাদান। এর শক্তিশালী ঔষধি গুণাগুণের কারণে জিনসেং আজ বিশ্বব্যাপী ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। জিনসেং স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে, শরীরের এনার্জি বাড়ায়, অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং যৌনক্ষমতা বৃদ্ধিতেও কার্যকর ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া এটি সামগ্রিকভাবে শরীর ও মনকে সতেজ রাখতে সহায়ক। এই লেখায় জিনসেং কি কাজ করে, উপকারিতা, ব্যবহারবিধি এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

আরও পড়ুনঃ Xinc B এর কাজ কি? 

জিনসেং কি কাজ করে? 

জিনসেং হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ উদ্ভিদ, যা প্রধানত এশিয়া মহাদেশে বিশেষ করে চীন ও কোরিয়ায় এবং উত্তর আমেরিকার কিছু অঞ্চলে জন্মায়। শত শত বছর ধরে এটি প্রাচীন চীনা ও কোরিয়ান চিকিৎসা পদ্ধতিতে অত্যন্ত মূল্যবান ওষুধি উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। জিনসেংয়ের মূল অংশটিই মূলত ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, কারণ এই অংশে এমন সব সক্রিয় উপাদান রয়েছে যা শরীর ও মনের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

জিনসেং এর উপকারিতা এতই বিস্তৃত যে সংক্ষেপে বলা কঠিন। তবুও এর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গুণের মধ্যে রয়েছে। এটি যৌন আকাঙ্ক্ষা বাড়াতে সহায়ক এবং সন্তান ধারণে অক্ষমতা কমাতে ভূমিকা রাখে। নিয়মিত সেবনে শরীরের জীবনীশক্তি বৃদ্ধি পায়, স্নায়বিক দুর্বলতা ও মানসিক চাপ হ্রাস পায়। এছাড়া ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় এটি সহায়ক ভেষজ উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

জিনসেং খাওয়ার নিয়ম কী? 

জিনসেংয়ের মূল পাতলা করে স্লাইস করে কেটে সরাসরি চিবিয়ে খাওয়া যায়। প্রতিদিন ১-২ গ্রাম কাঁচা মূল খাওয়া যেতে পারে। যদি পাউডার হিসেবে খান, তবে ১/২ থেকে ১ চা চামচ পাউডার কুসুম গরম পানি, দুধ বা মধুর সাথে মিশিয়ে খাওয়া যায়। এটি ওটমিল বা স্মুদিতেও মেশানো যায়। পাতলা স্লাইস করা মূল বা ১ চা চামচ পাউডার ১ কাপ গরম পানিতে ৫-১০ মিনিট ভিজিয়ে রেখে চা হিসেবে পান করতে পারেন। স্বাদের জন্য মধু মিশিয়ে নিতে পারেন।

বাজারে সাধারণত ৫০০ মি.গ্রা.-এর ক্যাপসুল পাওয়া যায়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দিনে ১টি বা ২টি ক্যাপসুল খাওয়া যেতে পারে। জিনসেং শরীরের শক্তি বাড়ায়, তাই এটি সকালে বা দুপুরের খাবারের আগে খাওয়া সবচেয়ে ভালো। এটি শরীরের ক্লান্তি দূর করে শরীরকে সজাগ রাখে, তাই রাতে খেলে ঘুমের সমস্যা বা ইনসোমনিয়া হতে পারে। 

জিনসেং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াঃ 

Side effects of ginseng

জিনসেং যেমন নানাবিধ উপকারিতা প্রদান করে, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে এটি শরীরের উপর বিরূপ প্রভাবও ফেলতে পারে। বিশেষ করে অতিরিক্ত মাত্রায় বা নিয়ম না মেনে সেবন করলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। জিনসেং এর সবচেয়ে পরিচিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ঘুমের সমস্যা। চা বা কফির মতোই এটি শরীরকে উদ্দীপিত করে, ফলে অনেকের ক্ষেত্রে ঘুম আসতে দেরি হয় বা অনিদ্রা দেখা দিতে পারে।

এটি স্নায়ুতন্ত্রকে উত্তেজিত করে মানসিক সজাগতা বাড়ালেও এর ফলে কিছু সাধারণ শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিছু বিশেষ অবস্থায় জিনসেং সেবনে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন, যা নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলোঃ 

  • শিশুদের ক্ষেত্রে সমস্যা

ছোট শিশুদের জন্য জিনসেং নিরাপদ বলে প্রমাণিত নয়। তাদের স্নায়ুতন্ত্র ও শারীরিক গঠন এখনও পরিপূর্ণভাবে বিকশিত না হওয়ায় জিনসেং বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। তাই শিশুদের ক্ষেত্রে জিনসেং ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলাই উত্তম।

  • গর্ভবতী মায়েদের জন্য ঝুঁকি

জিনসেং এর কিছু সক্রিয় উপাদান গর্ভাবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে এবং গর্ভপাতের সম্ভাবনাও বাড়াতে পারে। একইভাবে, যারা সন্তানকে বুকের দুধ পান করান, তাদের ক্ষেত্রেও জিনসেং নিরাপদ নয়। এ কারণে গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের জিনসেং সেবন না করাই ভালো।

  • হৃদরোগীদের ক্ষেত্রে সতর্কতা দরকার 

জিনসেং হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। যাদের আগে থেকেই হার্টের সমস্যা রয়েছে বা যারা হৃদরোগ সংক্রান্ত ওষুধ সেবন করছেন, তাদের ক্ষেত্রে জিনসেং ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই এ ধরনের রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া জিনসেং ব্যবহার করবেন না।

  • ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ 

জিনসেং রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে সক্ষম। ফলে যারা ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিন গ্রহণ করেন, তাদের ক্ষেত্রে হঠাৎ করে ব্লাড সুগার অতিরিক্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের জিনসেং ব্যবহারের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

  • অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পর জটিলতা

জিনসেং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। কিন্তু অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পর রোগীদের ইমিউন সিস্টেম দমিয়ে রাখার জন্য বিশেষ ওষুধ দেওয়া হয়। এই অবস্থায় জিনসেং সেই ওষুধের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে, যা মারাত্মক জটিলতার কারণ হতে পারে।

  • রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা

জিনসেং রক্ত জমাট বাঁধার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। ফলে যাদের রক্তক্ষরণের সমস্যা রয়েছে বা যারা অস্ত্রোপচারের আগে বা পরে রয়েছেন, তাদের জন্য জিনসেং ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এ সময় জিনসেং ব্যবহার এড়িয়ে চলাই নিরাপদ।

FAQs

জিনসেং কি ক্ষতিকারক হতে পারে?

জিনসেং গ্রহণের ফলে যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো দেখা যেতে পারে, সেগুলো সাধারণত হালকা ও সাময়িক হয়ে থাকে। বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে এতে গুরুতর কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি হয় না। সাধারণত অতিরিক্ত মাত্রায় সেবন করলে বা দীর্ঘদিন নিয়ম না মেনে গ্রহণ করলে এসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেশি লক্ষ্য করা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জিনসেং সেবন কমিয়ে দিলে বা কিছুদিন বিরতি নিলে সমস্যাগুলো আপনা আপনি সেরে যায়। 

জিনসেং কি প্রায়শই এবং উচ্চ মাত্রা নেওয়া যেতে পারে?

জিনসেং ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় দিক হলো এটি কম মাত্রায় গ্রহণ করলে অনেক সময় বেশি উপকার পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ডোজের তারতম্যের সঙ্গে এর কার্যকারিতারও পার্থক্য রয়েছে। গবেষণায় ৪০০ মিলিগ্রাম ডোজের তুলনায় ২০০ মিলিগ্রাম জিনসেং বেশি কার্যকর ফল প্রদান করেছে, যা থেকে বোঝা যায় সঠিক ও পরিমিত মাত্রায় ব্যবহারই জিনসেং এর সর্বোচ্চ উপকারিতা নিশ্চিত করে।

জিনসেং শরীরে কাজ করতে কতক্ষণ সময় লাগে?

জিনসেং সেবনের পর এর কার্যকারিতা সাধারণত ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শুরু হয়ে যায়। তবে অনেক ক্ষেত্রে ১২ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে স্পষ্ট কোনো পরিবর্তন বা প্রভাব অনুভূত নাও হতে পারে। এর কারণ হলো এর ফলাফল সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, জীবনযাপন পদ্ধতি এবং গ্রহণ করা ডোজের ওপর নির্ভর করে। কারও ক্ষেত্রে খুব দ্রুত ইতিবাচক প্রভাব দেখা দিলেও, আবার কারও শরীরে ধীরে ধীরে কাজ শুরু করে। 

জিনসেং কি লিভারের জন্য ক্ষতিকর?

না, জিনসেং সিরোসিস, ফ্যাটি লিভার এবং দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিসের মতো সাধারণ লিভারজনিত সমস্যায় সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারে। এছাড়াও এটি শরীরের ক্ষতিকর টক্সিন দূর করতে লিভারের ডিটক্সিফিকেশন প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করে তোলে, যার ফলে লিভারের উপর চাপ কমে। নিয়মিত ও সঠিক মাত্রায় জিনসেং ব্যবহার করলে লিভারের কর্মক্ষমতা উন্নত হতে পারে।

রাতে কি জিনসেং গ্রহণ করা যায়?

জিনসেং সেবনের ফলে কিছু ক্ষেত্রে অনিদ্রার সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যারা নিয়মিত ঘুমাতে যাওয়ার ঠিক আগে জিনসেং গ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে ঘুমের ব্যাঘাত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। ঘুমানোর কয়েক ঘণ্টা আগে জিনসেং সেবন করলে এর উত্তেজক প্রভাব অনেকটাই কমে যায় এবং শরীর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ঘুমের জন্য প্রস্তুত হতে পারে। 

Author

  • ডাঃ তানহা একজন নিবেদিতপ্রাণ মেডিসিন ও গাইনী বিশেষজ্ঞ, যিনি বর্তমানে একটি সরকারি হাসপাতালে কর্মরত আছেন। অভ্যন্তরীণ রোগ ও নারীস্বাস্থ্য বিষয়ে তার বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। তিনি নারীদের স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সঠিক ও প্রমাণভিত্তিক তথ্য প্রচারে বিশ্বাসী। Emergencypillbd.com-এ তিনি নিয়মিতভাবে প্রেগন্যান্সি, পিরিয়ড, ইমার্জেন্সি পিল এবং নারীস্বাস্থ্য বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ লেখা শেয়ার করে থাকেন, যা নারীদের সুস্থ জীবনযাপনে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

Leave a Comment