EDD বা Estimated Due Date কিভাবে বের করবো? সহজ পদ্ধতি

গর্ভধারণের সঠিক সময় নির্ধারণ মা ও অনাগত শিশুর সুস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। গর্ভাবস্থার সময়কাল জানা থাকলে চিকিৎসক যেমন সঠিক চিকিৎসা ও পরামর্শ দিতে পারেন, তেমনি মা নিজেও গর্ভের প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ করেন। এর মাধ্যমে নিয়মিত চেকআপ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ পর্যবেক্ষণ করা সহজ হয়।

সাধারণত গর্ভাবস্থার সময় গণনা করা হয় সপ্তাহের ভিত্তিতে, যদিও অনেকেরই মাস অনুযায়ী হিসাব জানার আগ্রহ থাকে। গর্ভাবস্থার সঠিক হিসাব জানা থাকলে সম্ভাব্য প্রসবের তারিখ, গুরুত্বপূর্ণ আল্ট্রাসনোগ্রাম এবং অন্যান্য চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণে সুবিধা হয়। এখন থেকে চাইলে আপনিও খুব সহজেই নিজে গর্ভাবস্থার সময়কাল হিসাব করতে পারবেন। নিচে গর্ভাবস্থার সপ্তাহ ও মাস নির্ণয়ের সহজ ও কার্যকর পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

আরও পড়ুনঃ পিরিয়ডের পর কখন গর্ভধারণের সম্ভাবনা বেশি?

Estimated Due Date কী?

গর্ভাবস্থার সময়কাল হিসাব করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাথমিক ধাপ হলো শেষ মাসিকের প্রথম দিন সঠিকভাবে মনে রাখা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই তারিখটিকেই গর্ভাবস্থার গণনার ভিত্তি ধরা হয়, কারণ প্রকৃত গর্ভধারণের নির্দিষ্ট দিন অনেক সময় নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তাই শেষ মাসিকের প্রথম দিন থেকেই গর্ভাবস্থার সময় গণনা শুরু করা হয় এবং এটিকেই সম্ভাব্য গর্ভধারণের সূচনাকাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

EDD বা Estimated Due Date কিভাবে বের করবো?

সাধারণভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ গর্ভাবস্থার সময়কাল ধরা হয় প্রায় ৪০ সপ্তাহ বা প্রায় ৯ মাস। এই সময়সীমা শেষ মাসিকের প্রথম দিন থেকে শুরু করে সন্তানের জন্মের দিন পর্যন্ত গণনা করা হয়। চিকিৎসকেরা গর্ভাবস্থার প্রতিটি ধাপ এই সপ্তাহভিত্তিক হিসাবের মাধ্যমেই নির্ধারণ করে থাকেন। এতে করে মা ও শিশুর শারীরিক অবস্থার সঠিক মূল্যায়ন করা সহজ হয়।

প্রতি ৪ সপ্তাহকে ১ মাস হিসেবে গণনা করা হয়। যদিও প্রকৃতপক্ষে সব মাস সমান দৈর্ঘ্যের নয়, তবুও গর্ভাবস্থার হিসাব সহজ করার জন্য এই পদ্ধতিই বেশি ব্যবহৃত হয়। উদাহরণস্বরূপ, ১২ সপ্তাহ মানে প্রায় ৩ মাস, ২৪ সপ্তাহ মানে প্রায় ৬ মাস এবং ৩৬ সপ্তাহ মানে প্রায় ৯ মাস।

এইভাবে শেষ মাসিকের প্রথম দিনকে ভিত্তি ধরে সপ্তাহ ও মাস অনুযায়ী গর্ভাবস্থার সময়কাল গণনা করলে সম্ভাব্য প্রসবের তারিখ নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং নিয়মিত চিকিৎসা পরিকল্পনা গ্রহণ করা অনেক সহজ হয়ে যায়।

Estimated Due Date বের করার পদ্ধতিঃ 

correct method of EDD

আপনি যদি গর্ভাবস্থার বর্তমান সপ্তাহ জানতে চান, তাহলে খুব সহজ একটি পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন। গর্ভাবস্থার সপ্তাহ নির্ণয়ের সহজ নিয়মঃ 

  1. সবার আগে আপনার শেষ মাসিকের প্রথম দিনটি নিশ্চিতভাবে মনে রাখতে হবে। এই তারিখটিকেই গর্ভাবস্থার হিসাব শুরুর মূল ভিত্তি ধরা হয়।
  2. এখন শেষ মাসিকের প্রথম দিন থেকে আজকের তারিখ পর্যন্ত মোট কয় দিন পার হয়েছে তা হিসাব করুন।
  3. মোট দিনসংখ্যাকে ৭ দিয়ে ভাগ করুন, কারণ এক সপ্তাহে ৭ দিন থাকে।
  4. ভাগফলের যে ফলাফল পাবেন, সেটিই হবে আপনার গর্ভাবস্থার মোট সপ্তাহ। দশমিক থাকলে সেটি অতিরিক্ত দিনের নির্দেশনা দেয়।

আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে Estimated Due Date বের করতে হয় কীভাবে? 

গর্ভাবস্থার প্রাথমিক পর্যায়ে আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষার মাধ্যমে ভ্রূণের দৈর্ঘ্য ও বৃদ্ধি পরিমাপ করে গর্ভকাল কতদিন চলছে তা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব। বিশেষ করে যাদের মাসিক অনিয়মিত বা শেষ মাসিকের তারিখ স্পষ্টভাবে মনে নেই, তাদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আল্ট্রাসাউন্ড গর্ভধারণের প্রকৃত সময়কাল নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

EDD পরিবর্তিত হওয়ার পেছনে কী কী কারণ থাকতে পারে?

Expected Date of Delivery প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ বিভিন্ন কারণে পরিবর্তিত হতে পারে। EDD পরিবর্তিত হওয়ার প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • ওভুলেশনের সঠিক সময়

অনেক নারীর ক্ষেত্রেই ওভুলেশন মাসিকের শুরুতে বা অনেক দেরিতে হতে পারে। ফলে প্রকৃত গর্ভধারণের সময়ের সাথে ক্যালেন্ডারের হিসাব না মিললে আল্ট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে EDD পরিবর্তিত হয়।

  • রিপোর্টের ভিন্নতা

গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে করা আল্ট্রাসনোগ্রাম সবচেয়ে নির্ভুল তথ্য দেয়। কিন্তু পরের দিকে করা আল্ট্রাসনোগ্রামে ভ্রূণের আকার বা দৈর্ঘ্যের ওপর ভিত্তি করে তারিখ কিছুটা এদিক সেদিক হতে পারে। 

  • মাসিক চক্রের অনিয়মিত দৈর্ঘ্য

যাদের মাসিক চক্র ২৮ দিনের চেয়ে বেশি বা কম, তাদের ক্ষেত্রে ক্যালেন্ডার পদ্ধতি ভুল ফলাফল দেয়। চক্রের দৈর্ঘ্যের পার্থক্যের কারণে ভ্রূণের বয়স ও প্রসবের তারিখে পরিবর্তন আনতে হয়।

  • ভ্রূণ বিকাশের গতি

প্রতিটি শিশুর বৃদ্ধির গতি একরকম নয়। গর্ভস্থ শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি যদি স্বাভাবিকের চেয়ে ধীর বা দ্রুত হয়, তবে চিকিৎসক প্রসবের সম্ভাব্য সময় সংশোধন করতে পারেন।

  • মায়ের শারীরিক জটিলতা

মায়ের যদি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা প্ল্যাসেন্টার কোনো সমস্যা থাকে, তবে নিরাপত্তার খাতিরে চিকিৎসক প্রসবের তারিখ এগিয়ে আনতে পারেন। এছাড়া যমজ সন্তান থাকলেও প্রসবের সময় সাধারণত নির্ধারিত তারিখের অনেক আগেই হয়ে থাকে।

FAQs

Naegele’s Rule নিয়মে EDD বের করার উপায় কী?

Naegele’s Rule অনুযায়ী প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ বা EDD বের করার মূল ভিত্তি হলো গর্ভবতী মহিলার শেষ মাসিকের প্রথম দিন। এই পদ্ধতিতে হিসাব করার জন্য প্রথমে LMP এর তারিখের সাথে ৭ দিন যোগ করতে হয়, এরপর প্রাপ্ত মাস থেকে ৩ মাস বিয়োগ করতে হয় এবং সবশেষে বছরের সাথে ১ বছর যোগ করতে হয়। 

নিয়মিত ও অনিয়মিত মাসিক চক্রের ক্ষেত্রে EDD নির্ণয়ের পদ্ধতিতে কী পার্থক্য আছে?

নিয়মিত ও অনিয়মিত মাসিক চক্রের ক্ষেত্রে EDD নির্ণয়ের প্রধান পার্থক্য হলো মাসিক চক্রের দৈর্ঘ্যের ওপর ভিত্তি করে দিনের হিসাব সমন্বয় করা। যদি কারো মাসিক চক্র ২৮ দিনের কম বা বেশি হয়, তবে সরাসরি নির্ধারিত নিয়ম ব্যবহার করলে প্রসবের সঠিক তারিখ পাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে নিয়ম হলো, চক্র ২৮ দিনের চেয়ে যত দিন বেশি হবে, প্রাপ্ত EDD এর সাথে তত দিন যোগ করতে হবে; আর ২৮ দিনের চেয়ে যত দিন কম হবে, প্রাপ্ত EDD থেকে তত দিন বিয়োগ করতে হবে। 

EDD কি শতভাগ নিশ্চিত হয়? 

না, EDD বা প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ কখনোই শতভাগ নিশ্চিত নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিশু নির্ধারিত তারিখের এক সপ্তাহ আগে বা পরে জন্মানোর সম্ভাবনা থাকে। সাধারণত গর্ভাবস্থার ৩৭ থেকে ৪২ সপ্তাহের মধ্যে যেকোনো সময় প্রসব হওয়াকে স্বাভাবিক ধরা হয়। তাই চিকিৎসকরা EDD কে একটি নির্দিষ্ট দিন হিসেবে না দেখে বরং একটি সময়সীমা হিসেবে বিবেচনা করার পরামর্শ দেন।

Author

  • ডাঃ তানহা একজন নিবেদিতপ্রাণ মেডিসিন ও গাইনী বিশেষজ্ঞ, যিনি বর্তমানে একটি সরকারি হাসপাতালে কর্মরত আছেন। অভ্যন্তরীণ রোগ ও নারীস্বাস্থ্য বিষয়ে তার বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। তিনি নারীদের স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সঠিক ও প্রমাণভিত্তিক তথ্য প্রচারে বিশ্বাসী। Emergencypillbd.com-এ তিনি নিয়মিতভাবে প্রেগন্যান্সি, পিরিয়ড, ইমার্জেন্সি পিল এবং নারীস্বাস্থ্য বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ লেখা শেয়ার করে থাকেন, যা নারীদের সুস্থ জীবনযাপনে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

Leave a Comment